দর্পণ (Mirror)
দর্পণ হলো একটি মসৃণ প্রতিফলক তল, যেখানে আলোর নিয়মিত প্রতিফলনের ফলে কোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব দেখা যায়। অন্যভাবে বলা যায়, দর্পণ এমন একটি পৃষ্ঠ যা বস্তু থেকে আসা আলোকরশ্মিকে প্রতিফলিত করে চোখে পৌঁছে দেয় এবং ফলে আমরা বস্তুর প্রতিবিম্ব দেখি।
দর্পণ প্রধানত দুই প্রকার
সমতল দর্পণ
গোলীয় দর্পণ
গোলীয় দর্পণ (Spherical Mirror)
যে দর্পণের প্রতিফলক পৃষ্ঠ কোনো গোলকের অংশবিশেষের মতো বক্র হয়, তাকে গোলীয় দর্পণ বলে। গোলীয় দর্পণ দুই প্রকার: অবতল দর্পণ এবং উত্তল দর্পণ। অবতল দর্পণে প্রতিফলক পৃষ্ঠ ভিতরের দিকে বাঁকা থাকে, আর উত্তল দর্পণে প্রতিফলক পৃষ্ঠ বাইরের দিকে বাঁকা থাকে।
👉 গোলীয় দর্পণের বিস্তারিত রশ্মি চিত্র ও প্রতিবিম্ব গঠন আলাদা অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সমতল দর্পণ (Plane Mirror)
যে দর্পণের প্রতিফলক পৃষ্ঠ সমতল এবং মসৃণ, তাকে সমতল দর্পণ বলে। সমতল দর্পণে আলোর নিয়মিত প্রতিফলনের ফলে বস্তুর কাল্পনিক প্রতিবিম্ব গঠিত হয়।
সমতল দর্পণ
Plane Mirror
সমতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য
👉 সমতল দর্পণ দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
🔹 প্রতিবিম্বটি কাল্পনিক হয়। তাই এটি পর্দায় ফেলা যায় না।
🔹 প্রতিবিম্বটি সমশীর্ষ হয়, অর্থাৎ সোজা দেখা যায়।
🔹 প্রতিবিম্বের আকার ও আকৃতি বস্তুর সমান হয়।
🔹 প্রতিবিম্বে পার্শ্বীয় বিপরীতকরণ দেখা যায়। অর্থাৎ বস্তুর বাম দিক প্রতিবিম্বের ডান দিকে এবং বস্তুর ডান দিক প্রতিবিম্বের বাম দিকে দেখা যায়।
🔹 বস্তু থেকে দর্পণের দূরত্ব এবং দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব সমান হয়।
🔹 বস্তু ও প্রতিবিম্বকে যুক্তকারী সরলরেখাটি দর্পণকে লম্বভাবে ছেদ করে।
পার্শ্বীয় বিপরীতকরণ (Lateral Inversion)
সমতল দর্পণে প্রতিফলনের ফলে প্রতিবিম্বের পার্শ্বীয় পরিবর্তন দেখা যায়। অর্থাৎ বস্তুর বাম দিক প্রতিবিম্বের ডান দিকে এবং বস্তুর ডান দিক প্রতিবিম্বের বাম দিকে দেখা যায়। পদার্থবিজ্ঞানে সমতল দর্পণে আলোর প্রতিফলনের এই বিশেষ ঘটনাকে পার্শ্বীয় বিপরীতকরণ বা Lateral Inversion বলা হয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে: দর্পণ আসলে বস্তুর বাম ও ডান দিককে সরাসরি বদলে দেয় না। সমতল দর্পণে বস্তুর সামনে-পেছনের দিক উল্টে যায় বলে আমাদের মস্তিষ্কে বাম-ডান পরিবর্তনের ভ্রম তৈরি হয়। তাই দর্পণের ভিতরে আমরা নিজের যে প্রতিবিম্ব দেখি, সেটি বাস্তব ব্যক্তি নয়; বরং এমন একটি কাল্পনিক প্রতিবিম্ব, যা দর্পণের পেছনে একই দূরত্বে আছে বলে মনে হয়।
পার্শ্বীয় বিপরীতকরণের বৈশিষ্ট্য
⭐ প্রতিবিম্বে বস্তুর বাম দিক ডান দিকে এবং ডান দিক বাম দিকে দেখা যায়।
⭐ সমতল দর্পণে লেখা দেখলে অনেক সময় অক্ষর উল্টো মনে হয়।
⭐ সম্পূর্ণ প্রতিসম অক্ষরের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সহজে বোঝা যায় না। যেমন: A, H, I, M, O, T, U, V, W, X, Y ইত্যাদি অক্ষর তুলনামূলকভাবে প্রতিসম হওয়ায় দর্পণে এগুলোর পরিবর্তন কম চোখে পড়ে।
অ্যাম্বুলেন্সের লেখা উল্টো থাকে কেন?
অ্যাম্বুলেন্সের সামনে সাধারণত AMBULANCE শব্দটি উল্টোভাবে লেখা থাকে। এর কারণ হলো, সামনে চলা গাড়ির চালক পিছনের আয়নায় শব্দটি দেখলে সেটি সোজা ও স্পষ্টভাবে পড়তে পারেন। ফলে চালক দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সকে রাস্তা ছেড়ে দিতে পারেন।
দুটি সমতল দর্পণে প্রতিবিম্বের সংখ্যা
দুটি সমতল দর্পণ পরস্পর একটি নির্দিষ্ট কোণে আনত থাকলে কোনো বস্তুর একাধিক প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। প্রতিবিম্বের সংখ্যা নির্ভর করে দর্পণ দুটির মধ্যবর্তী কোণ -এর ওপর।
যদি, তবে x-এর মান দেখে প্রতিবিম্বের সংখ্যা নির্ণয় করা হয়।
নিয়ম 1: x জোড় পূর্ণসংখ্যা হলে
যদি -এর মান জোড় পূর্ণসংখ্যা হয়, তাহলে প্রতিবিম্বের সংখ্যা হবে: N = x − 1
এই ক্ষেত্রে বস্তুটি দর্পণ দুটির কোণ দ্বিখণ্ডকের ওপর থাকুক বা না থাকুক, প্রতিবিম্বের সংখ্যা একই থাকে।
উদাহরণ: দুটি দর্পণের মধ্যবর্তী কোণ হলে,
এখানে 4 একটি জোড় পূর্ণসংখ্যা। তাই প্রতিবিম্বের সংখ্যা: 4 − 1 = 3
নিয়ম 2: x বিজোড় পূর্ণসংখ্যা হলে যদি -এর মান বিজোড় পূর্ণসংখ্যা হয়, তাহলে বস্তুর অবস্থানের ওপর প্রতিবিম্বের সংখ্যা নির্ভর করে।
🔹 বস্তুটি দর্পণ দুটির কোণ দ্বিখণ্ডকের ওপর থাকলে প্রতিবিম্বের সংখ্যা হবে: x − 1
🔹 বস্তুটি কোণ দ্বিখণ্ডকের ওপর না থাকলে প্রতিবিম্বের সংখ্যা হবে: x
উদাহরণ: দুটি দর্পণের মধ্যবর্তী কোণ হলে,
এখানে 5 একটি বিজোড় পূর্ণসংখ্যা। তাই বস্তুটি কোণ দ্বিখণ্ডকের ওপর থাকলে প্রতিবিম্ব হবে 5 − 1 = 4 টি, আর কোণ দ্বিখণ্ডকের ওপর না থাকলে প্রতিবিম্ব হবে টি।
নিয়ম 3: x পূর্ণসংখ্যা না হলে
যদি -এর মান পূর্ণসংখ্যা না হয়, তাহলে প্রতিবিম্বের সংখ্যা হবে ঐ মানের পূর্ণসংখ্যা অংশ।
উদাহরণ: দুটি দর্পণের মধ্যবর্তী কোণ হলে,
এখানে পূর্ণসংখ্যা অংশ 4। তাই প্রতিবিম্বের সংখ্যা হবে 4 টি।
নিয়ম 4: দুটি দর্পণ সমান্তরাল হলে
দুটি সমতল দর্পণ পরস্পর সমান্তরাল হলে তাদের মধ্যে বারবার প্রতিফলনের ফলে অসীম সংখ্যক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। এই ক্ষেত্রে উপরের সূত্র প্রয়োগ করা হয় না, কারণ দর্পণ দুটির মধ্যবর্তী কোণ ।
পেরিস্কোপ (Periscope)
পেরিস্কোপ হলো একটি সরল আলোকীয় যন্ত্র, যার সাহায্যে কোনো আড়াল বা বাধার ওপর দিয়ে অথবা চারপাশ থেকে কোনো বস্তু দেখা যায়। এটি সাধারণত দুটি সমতল দর্পণ বা দুটি প্রিজম ব্যবহার করে আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে কাজ করে।
পেরিস্কোপের গঠন
পেরিস্কোপ সাধারণত একটি লম্বা ফাঁপা নল বা টিউব দিয়ে তৈরি। নলের ওপরের ও নিচের প্রান্তে দুটি সমতল দর্পণ বসানো থাকে। দর্পণ দুটি সাধারণত নলের অক্ষের সঙ্গে কোণে স্থাপন করা হয় এবং তারা পরস্পরের সমান্তরাল থাকে।
পেরিস্কোপের কার্যপ্রণালী
কোনো বস্তু থেকে আসা আলো প্রথমে ওপরের দর্পণে আপতিত হয়। সেখান থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে নিচের দর্পণে পৌঁছায়। এরপর নিচের দর্পণ থেকে আলো আবার প্রতিফলিত হয়ে পর্যবেক্ষকের চোখে আসে। ফলে সরাসরি দেখা যায় না এমন বস্তুকেও আড়াল থেকে দেখা সম্ভব হয়।
পেরিস্কোপের ব্যবহার
⭐ ডুবোজাহাজ থেকে পানির উপরিভাগ পর্যবেক্ষণ করতে।
⭐ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিখা বা আড়ালের পেছন থেকে চারপাশ দেখতে।
⭐ ট্যাংক ও সামরিক যানে নিরাপদ পর্যবেক্ষণের জন্য।
⭐ স্কুলের বিজ্ঞান প্রজেক্টে আলোর প্রতিফলনের নিয়ম বোঝাতে।
ক্যালাইডোস্কোপ (Kaleidoscope)
ক্যালাইডোস্কোপ হলো আলোর প্রতিফলনের নীতিতে কাজ করা একটি মজার আলোকীয় খেলনা বা যন্ত্র। এতে কয়েকটি সমতল দর্পণ এবং রঙিন কাচের টুকরো ব্যবহার করে সুন্দর, প্রতিসম ও বারবার পরিবর্তনশীল জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা হয়।
ক্যালাইডোস্কোপের গঠন
ক্যালাইডোস্কোপ সাধারণত একটি ফাঁপা নল দিয়ে তৈরি হয়। নলের ভেতরে দুই বা তিনটি সমতল দর্পণ একটি নির্দিষ্ট কোণে পরস্পরের দিকে মুখ করে বসানো থাকে। নলের এক প্রান্তে আলগা রঙিন কাচের টুকরো, পুঁতি বা ছোটো রঙিন বস্তু রাখা হয়। অন্য প্রান্তে চোখ রাখার জন্য একটি ছোট ছিদ্র থাকে।
ক্যালাইডোস্কোপের কার্যপ্রণালী
যখন আমরা ক্যালাইডোস্কোপের ছিদ্র দিয়ে তাকাই, তখন নলের ভিতরের রঙিন টুকরোগুলি দর্পণগুলিতে বারবার প্রতিফলিত হয়। এই বহুবার প্রতিফলনের ফলে রঙিন টুকরোগুলি একটি সুন্দর, প্রতিসম ও নিয়মিত নকশা হিসেবে দেখা যায়। নলটি সামান্য ঘোরালেই রঙিন টুকরোগুলির অবস্থান বদলে যায় এবং নতুন নকশা তৈরি হয়।
দ্রুত পুনরালোচনা
⭐ দর্পণ হলো মসৃণ প্রতিফলক তল।
⭐ দর্পণ প্রধানত দুই প্রকার: সমতল দর্পণ ও গোলীয় দর্পণ।
⭐ সমতল দর্পণে কাল্পনিক, সমশীর্ষ, সমান আকারের এবং পার্শ্বীয়ভাবে বিপরীত প্রতিবিম্ব গঠিত হয়।
⭐ পার্শ্বীয় বিপরীতকরণের কারণে দর্পণে বাম-ডান পরিবর্তন দেখা যায়।
⭐ দুটি সমতল দর্পণ নির্দিষ্ট কোণে থাকলে একাধিক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।
⭐ পেরিস্কোপে দুটি দর্পণ বা প্রিজমের সাহায্যে আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে আড়াল থেকে বস্তু দেখা যায়।
⭐ ক্যালাইডোস্কোপে বহুবার প্রতিফলনের ফলে সুন্দর প্রতিসম নকশা তৈরি হয়।
💡 সাধারণ ভুল ধারণা
| ভুল ধারণা | সঠিক ধারণা |
|---|---|
| সমতল দর্পণে বাস্তব প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। | সমতল দর্পণে কাল্পনিক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। |
| দর্পণ বস্তুর বাম ও ডান দিক সত্যিই বদলে দেয়। | দর্পণে সামনে-পেছনের দিক উল্টে যাওয়ার কারণে বাম-ডান পরিবর্তনের ভ্রম তৈরি হয়। |
| সমতল দর্পণে প্রতিবিম্ব ছোটো বা বড়ো হয়। | সমতল দর্পণে প্রতিবিম্ব বস্তুর সমান আকারের হয়। |
| দুটি সমান্তরাল দর্পণে সীমিত সংখ্যক প্রতিবিম্ব হয়। | দুটি সমান্তরাল দর্পণে অসীম সংখ্যক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। |
| পেরিস্কোপে প্রতিসরণের জন্য দেখা যায়। | সরল পেরিস্কোপে মূলত প্রতিফলনের সাহায্যে দেখা যায়। |
| ক্যালাইডোস্কোপে রঙিন আলো তৈরি হয়। | ক্যালাইডোস্কোপে রঙিন টুকরোর বহুবার প্রতিফলনে নকশা তৈরি হয়। |