তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বকীয় ফল (Magnetic Effect of Electric Current)

কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চললে পরিবাহীর চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বকীয় ফল (Magnetic Effect of Electric Current) বলা হয়।

ড্যানিশ বিজ্ঞানী হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড (Hans Christian Ørsted) 1820 সালে প্রথম পরীক্ষার মাধ্যমে তড়িৎ প্রবাহ ও চৌম্বকত্বের মধ্যে সম্পর্ক প্রদর্শন করেন।

👉 ওরস্টেডের পরীক্ষা (Oersted's Experiment)

একটি চুম্বক শলাকাকে অনুভূমিকভাবে উত্তর-দক্ষিণ দিকে রাখা হলো। শলাকার কাছাকাছি এবং তার সমান্তরালে একটি সোজা পরিবাহী তার রাখা হলো। তারটি একটি তড়িৎ উৎস, সুইচ এবং বর্তনীর সঙ্গে যুক্ত করা হলো।

সুইচ বন্ধ করে তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে দেখা যায়, চুম্বক শলাকার উত্তর মেরু তার স্বাভাবিক উত্তর-দক্ষিণ অবস্থান থেকে বিক্ষিপ্ত হয়।

প্রবাহ বন্ধ করলে শলাকাটি আবার প্রায় উত্তর-দক্ষিণ অবস্থানে ফিরে আসে। আবার প্রবাহের দিক উলটে দিলে শলাকার বিক্ষেপের দিকও উলটে যায়।

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে তড়িৎ প্রবাহের জন্য তারের চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে।

ওরস্টেডের পরীক্ষায় বিক্ষেপের দিক

নিচের ছকটি সেই নির্দিষ্ট বিন্যাসের জন্য, যেখানে তারটি চুম্বক শলাকার সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর সমান্তরাল এবং A-B প্রান্তের দিক পূর্বনির্ধারিত।

পরিবাহী তারের অবস্থানপ্রবাহের অভিমুখN-মেরুর বিক্ষেপ

1. চুম্বক শলাকার উপরে

উত্তর থেকে দক্ষিণে B → Aপূর্ব দিকে

2. চুম্বক শলাকার উপরে

দক্ষিণ থেকে উত্তরে A → Bপশ্চিম দিকে

3. চুম্বক শলাকার নিচে

উত্তর থেকে দক্ষিণে B → Aপশ্চিম দিকে

4. চুম্বক শলাকার নিচে

দক্ষিণ থেকে উত্তরে A → Bপূর্ব দিকে

তারের অবস্থান বা ছবির অভিমুখ পরিবর্তন করলে পূর্ব-পশ্চিম বিক্ষেপের দিকও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু ছক মুখস্থ না করে ক্ষেত্রের দিক নির্ণয়ের নিয়ম বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সিদ্ধান্ত

ওরস্টেডের পরীক্ষা থেকে বোঝা যায়—

  • তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।
  • তড়িৎ প্রবাহের দিক পরিবর্তন করলে উৎপন্ন চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকও পরিবর্তিত হয়।
  • চুম্বক শলাকার বিক্ষেপ সেই চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতির প্রমাণ।
  • তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হলে এই ক্ষেত্রও বিলুপ্ত হয়।

সুতরাং, তড়িৎ প্রবাহ এবং চৌম্বকত্ব একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

👉 অ্যাম্পিয়ারের সাঁতরণ নিয়ম (Ampere's Swimming Rule)

চুম্বক শলাকার বিক্ষেপের দিক বোঝাতে ঐতিহাসিকভাবে অ্যাম্পিয়ারের সাঁতরণ নিয়ম ব্যবহার করা হয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি তড়িৎবাহী তারের উপর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের দিকে মুখ করে সাঁতার কাটছে এবং তার মুখ চুম্বক শলাকার দিকে রয়েছে। তখন তার বাম হাত যেদিকে থাকবে, চুম্বক শলাকার উত্তর মেরু সেই দিকে বিক্ষিপ্ত হবে।

এই নিয়মটি বিশেষ করে তারের সঙ্গে চুম্বক শলাকার অবস্থান অনুযায়ী বিক্ষেপের দিক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

👉 ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নিয়ম (Right-Hand Thumb Rule)

সোজা তড়িৎবাহী তারের চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক নির্ণয়ের সবচেয়ে প্রচলিত নিয়ম হলো Right-Hand Thumb Rule।

ডান হাত দিয়ে সোজা তারটিকে এমনভাবে ধরো যাতে প্রসারিত বুড়ো আঙুল তড়িৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে। তখন তারকে ঘিরে বাঁকানো বাকি চারটি আঙুল চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক নির্দেশ করবে।

অর্থাৎ—

  • বুড়ো আঙুল → তড়িৎ প্রবাহের দিক
  • বাঁকানো আঙুল → চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক

👉 সোজা তড়িৎবাহী তারের চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্র

একটি দীর্ঘ খাড়া তামার তারকে অনুভূমিক কার্ডবোর্ডের মধ্য দিয়ে নেওয়া হলো। কার্ডবোর্ডের উপর লৌহচূর্ণ ছড়িয়ে তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে লৌহচূর্ণগুলি তারের চারদিকে সমকেন্দ্রিক বৃত্তের মতো সাজতে দেখা যায়।

এ থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘ সোজা তড়িৎবাহী তারের চারপাশের চৌম্বক বলরেখাগুলি তারকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার।

প্রতিটি বলরেখার কোনো বিন্দুতে অঙ্কিত স্পর্শকের দিক সেই বিন্দুতে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক নির্দেশ করে।

চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে?

সোজা তড়িৎবাহী তারের ক্ষেত্রে—

  • তড়িৎ প্রবাহ বাড়লে চৌম্বক ক্ষেত্র শক্তিশালী হয়।
  • তার থেকে দূরত্ব বাড়লে চৌম্বক ক্ষেত্র দুর্বল হয়।

অর্থাৎ, একই দূরত্বে বেশি প্রবাহ বেশি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে।

প্রবাহের দিক বদলালে কী হয়?

সোজা তারে তড়িৎ প্রবাহের দিক উলটে দিলে তার চারদিকে সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকও উলটে যায়।

অর্থাৎ, Current direction পরিবর্তন করলে Magnetic field direction-ও পরিবর্তিত হয়।

এই ধারণা পরে তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর চৌম্বক বল এবং বৈদ্যুতিক মোটর বুঝতে বিশেষভাবে কাজে লাগে।

👉 বৃত্তাকার তড়িৎবাহী পরিবাহীর চৌম্বক ক্ষেত্র

একটি বৃত্তাকার তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে তার চারপাশেও চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।

বৃত্তের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশকে একটি ছোট সোজা তড়িৎবাহী তারের মতো ভাবা যায়। সব অংশের তৈরি চৌম্বক ক্ষেত্র বৃত্তের কেন্দ্রে একই দিকে মিলিত হওয়ায় কেন্দ্রের কাছে ক্ষেত্র তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়।

এক পাশ থেকে বৃত্তাকার তারটির দিকে তাকালে—

  • প্রবাহ দক্ষিণাবর্তী (clockwise) মনে হলে সেই পাশ দক্ষিণ মেরুর মতো আচরণ করে।
  • প্রবাহ বামাবর্তী (anticlockwise) মনে হলে সেই পাশ উত্তর মেরুর মতো আচরণ করে।

বিপরীত পৃষ্ঠে মেরুর প্রকৃতি বিপরীত হবে।

বৃত্তাকার তারের ক্ষেত্র কীভাবে শক্তিশালী করা যায়?

বৃত্তাকার তড়িৎবাহী পরিবাহীর কেন্দ্রে চৌম্বক ক্ষেত্র আরও শক্তিশালী হয় যদি—

  • তড়িৎ প্রবাহের মান বাড়ানো হয়।
  • একই পথে তারের পাক বা turns-এর সংখ্যা বাড়ানো হয়।
  • অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত রেখে বৃত্তাকার পাকের ব্যাসার্ধ কমানো হয়।

বহু পাকবিশিষ্ট বৃত্তাকার তার বা coil-এর প্রতিটি পাকের চৌম্বক ক্ষেত্র একই দিকে যুক্ত হয়।

👉 চুম্বক শলাকা দিয়ে কোষের মেরু শনাক্ত করার ধারণা

চুম্বক শলাকাটি উত্তর-দক্ষিণমুখী রেখে তারটির দুই প্রান্ত একটি কোষের দুই মেরুর সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তারে তড়িৎ প্রবাহ চললে শলাকার N-মেরুর বিক্ষেপ লক্ষ্য করে Ampere's swimming rule বা উপযুক্ত ক্ষেত্র-নিয়মের সাহায্যে প্রবাহের দিক নির্ণয় করা যায়।

প্রচলিত তড়িৎ প্রবাহ ধনাত্মক মেরু থেকে ঋণাত্মক মেরুর দিকে বহির্বর্তনীতে প্রবাহিত হয়। তাই প্রবাহের দিক জানা গেলে কোষের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মেরু শনাক্ত করা সম্ভব।

🧠 দ্রুত মনে রাখো

⭐ তড়িৎবাহী তারের চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।

⭐ ওরস্টেডের পরীক্ষায় চুম্বক শলাকার বিক্ষেপ এই ক্ষেত্রের প্রমাণ।

⭐ সোজা তারের চারদিকে চৌম্বক বলরেখাগুলি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত।

⭐ Right-Hand Thumb Rule দিয়ে সোজা তারের চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক নির্ণয় করা যায়।

⭐ তড়িৎ প্রবাহ বাড়লে চৌম্বক ক্ষেত্র শক্তিশালী হয় এবং তার থেকে দূরত্ব বাড়লে ক্ষেত্র দুর্বল হয়।

⭐ প্রবাহের দিক উলটালে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকও উলটে যায়।

⭐ বৃত্তাকার তারে clockwise current দেখা গেলে সেই পাশ দক্ষিণ মেরুর মতো এবং anticlockwise current দেখা গেলে উত্তর মেরুর মতো আচরণ করে।

✍ নিজে চেষ্টা করো

🔹 1. চুম্বক শলাকার কাছে তারে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে বিক্ষেপ কেন বন্ধ হয়?

🔹 2. প্রবাহের দিক উলটালে শলাকার বিক্ষেপের দিক কেন বদলে যায়?

🔹 3. সোজা তড়িৎবাহী তারের চারদিকে চৌম্বক বলরেখার আকৃতি কেমন?

🔹 4. Right-Hand Thumb Rule ব্যবহার করে কী নির্ণয় করা যায়?

🔹 5. সোজা তারে প্রবাহের মান বাড়ালে চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি কীভাবে পরিবর্তিত হবে?

🔹 6. তার থেকে দূরত্ব বাড়লে চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি কীভাবে পরিবর্তিত হয়?

🔹 7. বৃত্তাকার তারের একটি পাশে প্রবাহ anticlockwise দেখা গেলে সেই পাশ কোন মেরুর মতো আচরণ করবে?

🔹 8. বৃত্তাকার coil-এর পাকের সংখ্যা বাড়ালে কেন্দ্রে চৌম্বক ক্ষেত্রের কী পরিবর্তন হবে?